যৌন বৈচিত্র্য। লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার, কুইয়ার সহ এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে এক ধরনের টানাপোড়েন দীর্ঘদিনের। এই টানাপোড়েন রাষ্ট্রীয় আইন, সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধর্মীয় মূল্যবোধ সমন্বয়ে একটি রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে এই সম্প্রদায়কে।
ভিন্ন যৌন পরিচয়ের এ মানুষদের তৃতীয় বিশ্বের বাংলাদেশ নামক দেশের সমাজব্যবস্থায় জীবন, নিরাপত্তা, অধিকার ও গ্রহণযোগ্যতার অভিজ্ঞতা বেশ তিক্ত। এমনকি যে আইন রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা দেয়, সেই আইনি পরিবেশও বৈরী।
দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা ঐতিহাসিকভাবে সমলিঙ্গের কিছু ধরনের সম্পর্ককে চর্চার ক্ষেত্রে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এসেছে। এবং রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ধর্মের অন্তর্জালে এটি অসংশোধনীয় থেকে গেছে। এটি স্পষ্টতই রাষ্ট্র নাগরিকের অধিকারকে, স্বাধীনতাকে মানবাধিকারের প্রশ্নে বিতর্কের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো; ইসলাম ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী যে স্রষ্টা মানুষকে এমন বৈচিত্র্যময় করে সৃষ্টি করলেন, সে ইসলামই কেন যৌন পরিচয় প্রকাশ ও এর চর্চার ক্ষেত্রে একই মানুষকে হত্যাযজ্ঞ মনে করছে?
কোরানে বলা হয়েছে; আর (আমি পাঠিয়েছিলাম) লূতকে, যখন সে তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমরা কি এমন অশ্লীল কাজ করছ, যা তোমাদের আগে সারা বিশ্বের কেউ করেনি?
তোমরা তো নারীদের বাদ দিয়ে কামনার বশে পুরুষদের কাছে গমন করছ। বরং তোমরা সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।’”
(সূরা আল-আ’রাফ ৭:৮০–৮১)
আল্লাহ কোরানে সমকামিতার জন্য লূত জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের সকল প্রকার যৌন সম্পর্ককে কোরানে হারাম বলা হয়েছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে।
কিন্তু সংশয় এখানেই; যে স্রষ্টা মানুষ সৃষ্টি করলেন, সে স্রষ্টাই কেন একই মানুষকে স্বাভাবিকভাবে সৃষ্টি না করে তাকে ভিন্ন যৌন পরিচয়ে সৃষ্টি করলেন? এবং এই একই কারণে তাকে শাস্তির কথা বলছেন?
এখানে সৃষ্টিকর্তা নিজেই অপরাধ করছেন কিনা, এমন ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষের জীবনকে সংশয়ে ফেলে এটি প্রশ্নযোগ্য। এবং কোরানের এমন আয়াতের কারণেই অপর মুসলিমরা ধর্মের আইনের নামে এমনসব মানুষদের হত্যা করছে। হত্যাকে যায়েজ করে তুলছে।
বাংলাদেশে রয়েছে মৌলবাদ, উগ্রবাদ ও চরমপন্থী গোষ্ঠী। যারা শরিয়াহ আইনের বিষয়ে বেশ উদ্গ্রীব। এ গোষ্ঠী এলজিবিটিকিউ+ সম্প্রদায়ের মানুষকে হত্যাযজ্ঞ করে তুলেছে বিভিন্নভাবে। এমন বাস্তবতায় একজন ভিন্ন যৌন পরিচয়ের মানুষের মানবাধিকার প্রশ্নবিদ্ধ; জীবনের প্রতি আছে ঝুঁকি, সামাজিক ও পারিবারিক নিপীড়ন।
ধর্ম ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাঠামো যেখানে সমান্তরাল, সেখানে একজন মানুষ হিসেবে নিজস্ব পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকাটাই ঝুঁকিপূর্ণ। যে ধর্ম একজন মানুষকে হত্যাযজ্ঞ মনে করে, স্বয়ং স্রষ্টা তাঁর সৃষ্টির নিজস্ব পরিচয়কে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে, সেখানে ধর্ম কতটা মানবতাবাদ চর্চা করে তা বিবেচ্য বিষয়।
প্রতিটি যৌন পরিচয়ের মানুষের অধিকার, চর্চা এবং জীবনবোধের স্বাধীনতা সুনিশ্চিত হোক। একজন মানুষ হিসেবে নিজস্ব আত্মপরিচয় হোক উন্মুক্ত। প্রতিষ্ঠিত হোক মানবাধিকার, যেখানে ধর্মের বিবেচনা মানুষকে নিরাপত্তাহীনতার সংশয়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করবে না। রাষ্ট্র সবার।
যে স্রষ্ঠা (আল্লাহ) মানুষকে সৃষ্টি করলেন; যৌনতার ভিন্নতাকে প্রকাশ করলেন। যা মানুষের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণের বাহিরে। এবং একই কারণে তাদের হত্যা/ ধ্বংস করলেন, তাঁর সৃষ্টিকে ধর্মের আইনে এদের হত্যার পরোক্ষ নির্দেশটা দিলেন; সে স্রষ্ঠা কি ন্যায়বিচারক? নাকি স্রষ্ঠাও ইসলাম ধর্মের নামে উগ্রবাদ, মৌলবাদ ও চরমপন্থার বৈধতা দানকারী? এমন ধর্মের প্রতি এখন আর নিজস্ব শ্রদ্ধাবোধ নেই।






Leave a Reply